মেয়েটা যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল-
বাবার দিকে একটু লক্ষ্য রেখো মা
ভাই যেন ঠিকঠাক পড়াশুনা করে;
আরও বলেছিল- তোমাদের ছাড়া থাকতে পারবো না আমি…
ওর বিদায় লগ্নে –
শঙ্খ আর উলুধ্বনির তরঙ্গের সাথে
ভেসে গিয়েছিল আমাদের অব্যক্ত ব্যাথা দুর-দুরান্তে!
ভাবতে অবাক লাগে-
একটা মেয়ে রাতারাতি কেমন করে
এক নারীতে পরিনত হয়।
মেয়েটার কথামত লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখেছি
লোকটা ক্রমশ পাথরের মতো নির্বাক – নিরুৎসাহ,
জীবনের সব সুখ আনন্দ …
গ্রীষ্মের ডোবা পুকুরের জলের মতো
হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
ছেলেটা – ছেলেটা দিদির সংসারে সুখের জন্য
পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে
একটা মুদীর দোকানে কাজ করে।
মনে পড়ে-
ওরা যখন অষ্টমঙ্গলায় এসেছিল-
দারুন উৎফুল্ল ছিল মেয়েটা,
খুশীতে মুখখানি যেন পুর্নিমা চাঁদের মতো উজ্জ্বল
পাহাড়ী ঝর্নার মতো কল্লোলিনী সে।
যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল-
আমি খুব ভাল আছি মা।
তারপর ছ’মাসের মাথায় যখন এলো-
যেন চাঁদের গায়ে ছাপ ছাপ অন্ধকার
অনেকটা মলিন – ম্রিয়মান সে।
আমার কানপাশা জোড়া দেখতে না পেয়ে বলেছিল-
ওদের জন্য আর কত করবে মা?
যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল-
ওখানে আর ভাল লাগে না…
এক বছরের মাথায় মেয়েটা একাই এসেছিল;
তখন একেবারে বিধ্বস্ত-হতাশ,
লাল নীল হলুদ পছন্দের কয়েকটা শাড়ী
কিছু গয়না রেখে দিয়ে বলেছিল-
ও গুলো আর ভাল লাগে না মা ।
যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল-
আর কবে আসবো জানি না…
মেয়েটা আর কোনদিন ফিরে আসেনি-
শুধু একটা ফোন এসেছিল…
মাঝরাতে কিংবা ভোরের আগে।
সেদিন হয়তো আর ভোর হয়নি-
ভোরের পাখীগুলি আর কলোরব করেনি।
শুধু একটা কাক ডাকছিল ছাদের কার্নিশে
বুকটা আমার ব্যাথায় ভেঙে যাচ্ছিল!
মেয়েটার জীবনে আর কোনদিন ভোর আসেনি-
ভোরের আলো ফোটেনি।
মেয়েটা কোনদিন আর ফিরে আসেনি-
কোনদিন আর কিছু বলেনি…
সোনালী – সোনালী আবির মাখা রোদ –
সন্ধ্যা আদর করে নিয়ে গেছে তারে –
রাত্রির পর্ণ কুটিরে।।
আমি আকাশ জুড়ে তারই শব্দ ছবি –
কুড়ায়ে পেয়েছি –
মেহগনি পাতার ভিতর -।
এত কথা –
এত ঘর – এত নিবিড় আবেশ
অনেক – অনেক – বর্ণমালা – আর –
শব্দ জুড়ে – জুড়ে ।
সেদিনও কি সেই অবোধ বালক
দুধ ভাত মাখা হাতে –
দুধ ভাত মাখা ঠোঁটে –
মিশে যাবে তিমিরে – আঁধারে – ।।
সোনালী – সোনালী আবির মাখা রোদ –
সন্ধ্যা আদর করে নিয়ে গেছে তারে ?
রাত্রির পর্ণ কুটিরে।।
তবু কেন আকাশে বাতাসে –
এত সুর এত মেঘ –
এত বৃষ্টি বুকে –
নীল্ – ভাঙ্গা ভাঙ্গা – কবিতার মত – ।
মেঘ যদি মিশে যায় – শিশিরে শিশির ঝরে
আরবার –
মেঘ পোয়াতি রোদ্দুর সব –
সোনালী – সোনালী আবির মাখা রোদ ?
সন্ধ্যা আদর করে নিয়ে গেছে তারে –
রাত্রির পর্ণ কুটিরে।।
এসো তবে – অতিবৃধ্ধ – বটবৃক্ষখানি –
দৃষ্টি তোমার মেঘ হোক – রোদ হোক –
পৃথিবীর আড়াআড়ি সময়ের রেখা ধরে –
হামাগুড়ি দেওয়া – অলস সকাল।।
হাত ধরে তার – অবোধ বালক –
দুধ ভাত মাখা হাতে –
দুধ ভাত মাখা ঠোঁটে –
ফিরে যাক – ফিরে যাক – নিবিড় হৃদয় ।
শ্যামল সবুজে ঐযে রক্তে মাখা রবি
এযে বাংলার পতাকা আকাশের বুকে;
জ্ঞাত বিশ্ববাসী, জানি তা আমরা সবি
লক্ষ লাশেরও গন্ধ আজো পাই নাকে।
কত গর্বিত জনতা, স্বাধীনতা পেয়ে
বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়ে সারা দেশ;
এদিনে হাসির রেখা, বীরাঙ্গনা মায়ে
এখনও তবু যেন আতঙ্কের রেশ।
শহীদ সে পরিবার আজো আকিঞ্চনে
তাদের অস্তিত্ব ভারী, মুক্তির বিরোধী;
পুষ্টিতেও ভরপুর, চোরা মাল ধনে
সর্বস্বান্ত তারা, যারা তবে প্রতিবাদী।
দেখতে দেখতে, গত হলও চার যুগ
জনতা করবে কবে, স্বাধীনতা ভোগ ?
বিঃদ্রঃ –
চতুর্দশপদী
(বিজয় মাসের কবিতা)
আমার ঘরে কোথাও কোনও ঘড়ি নেই
পাশের ঘরে যেটা আছে –
তাও বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই –
সময়ের হাত ধরে হাঁটতে ভুলে গেছি তাই।
এই সময়-হীন সময় – অনেকটা
মহাশূন্যের মতো – ।।
কোনও – টান নেই – কোথাও।
কিন্তু তবু তো তার অস্তিত্ব বুঝি সর্বত্র –
সময় নেই – তবু – হিসাব আছে –
দিবা রাত্র –
বসন্ত – চলে যাওয়া – ফিরে যাওয়া আছে –
আছে কিছু স্মৃতি –
গভীর থেকে গভীরতর –
ভেসে ভেসে চলে যাওয়া
অনেক অনেক পেছানো
সময় নেই – তবু স্মৃতি আছে গোছানো।।
সময় নেই – তাই – সময়ে তোমাকে পাই না
সময় নেই – তাই – সময়ে তোমাকে চাই না –
সময় নেই – শুধু পর পর কিছু
ইতিহাস আছে সাজানো।
ফিরে যাও – ফিরে যাও –
হে আলোকবর্ষব্যপী – জ্যোতিষ্কমণ্ডল –
হে সপ্তর্ষিমণ্ডল –
হে বশিষ্ঠ – হে অরুন্ধতী – হে কালকূট
ফিরে যাও হে ঊর্ষা।
ক্লান্ত নদীতে অনেক জল বয়ে গেছে –
প্লাবন এসেছে – উজানে –
ইতিহাস খুঁড়ে খুঁড়ে –
অনেক কঙ্কাল সব ভাসিয়ে দিয়েছি –
দীর্ঘ পথ ঘুরে
চলে গেছে – চোখের আড়ালে –
সময় নেই – তাই হিসেব নেই –
কত গেল – আরও কত আছে
তাড়া নেই – গোনবার –
সময় নেই – ।।
Recent Comments